জন্মদিন কাছে আসলেই আমার মধ্যে একটা উত্তেজনা কাজ করে। ভাবনার দোলাচালে জীবনের উদ্দিষ্ট লক্ষ্য খুঁজি আর আত্মবিশ্লেষণে মগ্ন হই। পাওয়া না পাওয়ার অঙ্ক কষি আপন মনে। বিয়ের পর থেকে আমার জন্মদিনকে ঘিরে আমার থেকে বউ বেশি উত্তেজিত থাকে। তার বিভিন্ন উদ্যোগ-আয়োজনে জন্মদিন হয়ে ওঠে আনন্দ উৎসব। তাই ভাবলাম আমার ৩০তম জন্মদিনকে ঘিরে আনন্দ আয়োজনের গল্পটা লিখে রাখি ব্লগের পাতায়।
জন্মদিনে বউ ঠিক করে ছোট করে আয়োজন করবে। ও আমাদের বিল্ডিং এর বাচ্চাদের পড়ায়। ঠিক করা হয় জন্মদিনের দিন দুপুরে বাচ্চারা আসবে। মূলত বাচ্চাদের নিয়ে এই উদযাপন। আমার বউ খুব যত্ন করে সবজি, চিংড়ি, মাংস দিয়ে ন্যুডুলস রান্না করে। ঠিক করা হয় ন্যুডুলস বানানো হবে আর একটা কেক আনা হবে। আমার ছোট বোনকেও ওইদিন বাসায় আসতে বলি। ও আসলে আমরা সবাই দুপুরে পোলাও-মাংস খাব। প্ল্যান অনুযায়ী আগের দিন রান্নার সবকিছু কিনে রাখি। কেক কতটুকু নিব এটা নিয়ে অনেক যোগবিয়োগ করে এলাকার বেকারী থেকেই পাঁচ পাউন্ডের একটা ভ্যানিলা কেকের অর্ডার দিই।


ঠিক রাত ১২টায় বোন ফোন দিয়ে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানায়। বউ আমাকে চকোলেট, কুকিজ, ফুল উপহার দেয়। আমার শ্বশুর ফোন দিয়ে শুভ জন্মদিন জানান এবং সকালে আমাকে নিয়ে শপিং এ যাবেন ঠিক করেন। ঘুম থেকে উঠেই কাজে লেগে পড়তে হবে তাই বেশি রাত না করে শুয়ে পড়ি। জন্মদিনের দিন অফিস ডে হওয়ায় ওইদিন অফিস থেকে ছুটি নিয়ে রেখেছিলাম আগেই। সকালে উঠেই বোনকে ফোন দিয়ে কখন আসবে এটা নিশ্চিত করি। এরপর চলে যাই বসুন্ধরা শপিং মলে। শ্বশুর আব্বা আমাকে নিয়ে ঘুরে ঘুরে জামা, প্যান্ট কিনে দেন। শ্বাশুড়ী ও স্ত্রী মিলে আমার জন্য আগেই একটা জুতা পছন্দ করে টাকাও দিয়ে রেখেছিলেন। সেটাও এই সুযোগে মার্কেট থেকে কিনে নিই। এদিকে বোন বাসা থেকে রওয়ানা দিয়ে আমার বাসায় চলে এসেছে। আমি ওর জন্য ছোট একটা গিফট নিই। শ্বশুর আব্বা কিছু খাওয়াতে চাইলেন। কিন্তু বাসায় ফেরার তাড়া থাকায় বেশি কিছু না খেয়েই চলে আসতে হয়।


বাসায় গিয়ে দেখি বোন আমার জন্য পুডিং বানিয়ে এনেছে। এটা আমরা জন্মদিনের পরেও খেয়েছি। এত মজার পুডিং আমি আর বউ আগে কখনো খাইনি। বউ এর মধ্যে আমার জন্য একটা ফুলের তোড়া সাজিয়েছে। কিনে আনা রজনীগন্ধা, বারান্দার বাগানবিলাস আর আর্ট পেপার দিয়ে তৈরী ফুলদানীটি আমার জন্মদিনের অন্যতম সেরা উপহার। আমরা পোলাউ, গরুর মাংস দিয়ে দুপুরে খাবার খাই। বিল্ডিং এর বাচ্চারা সময়মতোই বাসায় চলে আসে। ওরা আমার জন্য চকোলেট, পানির মগ ও কাগজ কেটে হাতে বানানো কার্ড নিয়ে আসে। ওদের কার্ডের লেখা দেখে এক মুহূর্ত আমি ভাবি আংকেল তাহলে হয়েই গেলাম।
আমি দোকান থেকে কেক নিয়ে আসতে বের হই। কেক নিয়ে এসে দেখি বাসায় থাকা বেলুনগুলো বাচ্চারা ইতোমধ্যে ফুলিয়েছে। বাসার ভেতর একদল বাচ্চা, আমার বোন ও স্ত্রী, আমার বিড়ালগুলো, দুটো পোষা পাখি আর ভাসমান কিছু বেলুন। সব মিলিয়ে মনকে প্রশান্ত করে দেয় এই নয়নাভিরাম দৃশ্য। বাচ্চাদের নিয়ে কেক, বেলুন সহ ছবি তোলা হল। এরপর কেক কেটে সবাইকে কেক ও আমার স্ত্রীর হাতের ন্যুডুলস পরিবেশন করি। সবাই খুব মজা করে খায়। ওদের হাসি, আনন্দ, লাফালাফি দেখে আমার আনন্দ হয়। সন্ধ্যা হতেই সবাই বিদায় নেয়। আমি বোনকে বাসায় পৌঁছে দেয়ার জন্য বের হই। বৃহস্পতিবার হওয়ার কারণে রাস্তায় প্রচণ্ড যানজট পাই। বাসায় ঢুকতেই আব্বু-আম্মুর সাথে দেখা হয়। আম্মু কফি বানিয়ে দেন ও সাথে কিছু ফল দিয়ে দেন। কিছু সময় বাসায় থেকে আবার আমার বাসায় চলে আসি। এভাবেই শেষ হয় আমার অর্থবহ ৩০ বছর পৃথিবী ভ্রমণের আগমনী দিনটি।



জন্মদিন আমার জীবনে একটি উল্লেখযোগ্য দিন। এই দিনে জীবনের অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ নিয়ে মনের মধ্যে উঁকি দেয় নানা জল্পনা-কল্পনা। জীবন দীর্ঘ হোক বা না হোক অর্থবহ হওয়া দরকার। জীবন যেখানে যেমন আমি সেখানে তেমন। আমি জীবন নিয়ে কোন আফসোস করতে পছন্দ করি না। আমি মনে করি জীবনে চলার পথে যা ঘটে সবই কোন না কোন কারণে ঘটে। ভালোমন্দ মিলিয়েই মানব জীবন। তাই জন্মদিনে আমি নিজেকে বলি - অফি, কর্মে বাঁচো, সৃজনে বাঁচো, আনন্দে বাঁচো। আমি মানবিক মানুষ ভালোবাসি, পশুপাখি ভালোবাসি, গাছপালা ভালোবাসি, আমার ছোট জীবনটা তাই এদের নিয়েই সাজাতে চাই। জন্মদিনে আমাকে অনেকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন, আমাকে স্মরণ করেছেন। আমি আপনাদের কাছে কৃতজ্ঞ।

And in the end, it's not the years in your life that count. It's the life in your years.
- Abraham Lincoln