আমার প্রথম ইভি Tailg Phoenix F73 Review

আমার প্রথম ইভি Tailg Phoenix F73 Review

গ্রীক মাইথোলজিতে ফিনিক্স হচ্ছে এক অমর পাখির নাম। এটি ছাই থেকে আবার জন্ম নেয়। ইন্টারনেট ঘেঁটে ফিনিক্স পাখির ব্যবহারিক অর্থ পেলাম। ফিনিক্স এমন একটি বিষয় যা নিজস্ব ক্ষেত্রে নতুনত্বের প্রতীক। যাই হোক আমার ফিনিক্স পাখি আমার প্রথম ইলেকট্রিক বাইক Tailg Phoenix F73 এর সাথে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দিব এই লেখায়।

বাংলাদেশের দুই চাকার বাজারে ইলেকট্রিক বাইক একটি নতুন সংযোজন। আন্তর্জাতিক বাজারের Yadea, Revoo, Tailg, Zeeho, Ama, Huaihai এখন বাংলাদেশেই পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের আকিজ, ওয়াল্টনের টাকিয়ন, আরএফএল এর রাইডু মডেলের ইলেকট্রিক বাইকগুলোও বাজারে চলছে। পরিবেশবান্ধব এবং রক্ষণাবেক্ষণ খরচ তেলের বাইকের থেকে তুলনামূলক কম হওয়ায় বাইকগুলো মানুষের নজর কাড়ছে। আমি প্রায় চার বছর তেলের মোটরবাইক চালাচ্ছি। তাই এবার বাইক বদলে স্কুটার নিতে চাচ্ছিলাম। অবশেষে সব সমীকরণ মিলিয়ে নিয়ে নিলাম Tailg Phoenix F73 ইলেকট্রিক স্কুটার সেগমেন্টের মোটরবাইকটি।

স্কুটার কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর আমি বাজারে এভেইলেবল স্কুটারগুলো দেখতে থাকলাম। অফিশিয়াল এবং নতুন নিতে চাচ্ছিলাম তবে হাতে অপশন বেশ কম পাচ্ছিলাম। আমার বাজেটে বলতে গেলে হোন্ডা ডিও, সুজুকি এক্সেস, টিভিএস এনটর্ক কিংবা বড়োজোর ইয়ামাহা রে জেড আর মডেল এভেইলেবল ছিল। বাজেট বাড়ালে ভেস্পা এবং সিএফমোটো দেখা যেত। কোন মডেলই আমার তেমন পছন্দ হচ্ছিল না। এদিকে ইলেকট্রিক স্কুটারের অ্যাড আসতে লাগল। আমিও ভাবলাম এগুলো কেমন হবে দেখি। আমি কয়েক মাস আগে সরেজমিনে Yadea এবং Revoo এর শোরুম ঘুরে আসি। কিন্তু ইলেকট্রিক স্কুটার যেহেতু তেলের বাইকের থেকে একেবারেই আলাদা, সেহেতু সংশয়ে ছিলাম। পকেটের অবস্থাও ভালো ছিল না। তাই আরো একটু সময় নিলাম।

Ofi Khan seating on a Tailg Leopard F72 electric scooter
Tailg Leopard F72
Ofi Khan seating on a Revoo C03 electric scooter
Revoo C03 EV
Ofi Khan seating on a Yadea T5 electric scooter
Yadea T5 EV
Ofi Khan seating on a Tailg Phoenix F73 electric scooter
Tailg Phoenix F73

ইন্টারনেটে স্কুটার সার্চ ও ইউটিউব রিভিউ দেখতে থাকলাম। EV অর্থাৎ Electric Vehicle রিলেটেড ফেসবুক গ্রুপগুলোতে যুক্ত হলাম। এখানে আমি রিয়েল ইউজারদের অথেনটিক রিভিউ পেলাম। আমি তেলের বাইক চালিয়ে অভ্যস্ত। ১৬৫০০ কিলোমিটারের বেশি চালানো হয়েছে এই পর্যন্ত। এদিকে ইলেকট্রিক বাইকগুলোর স্পেসিফিকেশনে আমি স্পিড লিমিট দেখতে পাচ্ছিলাম। অধিকাংশ ইলেক্ট্রিক বাইকের সর্বোচ্চ গতি ৫৫ কিমি/ঘন্টা এবং এক চার্জে প্রায় ১০০ থেকে ১২০ কিমি যাওয়া যায়। এগুলোর দাম প্রায় এক লাখ থেকে এক লাখ ৪০ হাজারের মতো। আমার বাসা ৩০০ ফিটের কাছাকাছি এবং আমার ঢাকার মধ্যে সর্বোচ্চ ৩০ কিমির বেশি যাওয়া পড়ে না। আমি খেয়াল করে দেখলাম শহরে আমি ৬০ কিমি/ঘন্টা গতিতেই বেশিরভাগ সময় চালাই। তাই আমি চাচ্ছিলাম আরেকটু বেশি গতির বাইক নিতে। কিন্তু সেরকম এভেইলেবল বাইক পাচ্ছিলাম না।

ধীরে ধীরে বাজারে আরো অনেক ইলেকট্রিক মডেল আসতে থাকল। আমি ঠিক করলাম ৬০ কিমি/ঘন্টার বেশি বা সমান সর্বোচ্চ গতির ইলেকট্রিক বাইক নিব। আমার প্রয়োজনীয়তা এবং পছন্দের সাথে সামর্থ্যের যোগসূত্র মিলছিল না। পছন্দ তালিকায় যুক্ত হলো Zeeho AE8, Revoo E52, Yadea GT60, Tailg Phoenix F73। কোনটার লুক পছন্দ হয় না, তো কোনটার দাম বেশি মনে হচ্ছিল। আর ইলেকট্রিক বাইক যেহেতু এখনো বাংলাদেশে নতুন তাই আমি দুই লাখ দামের মধ্যে কিনতে চাচ্ছিলাম। আমি নিজে ট্রাই করার জন্য বিভিন্ন শোরুমে গিয়ে বাইক দেখলাম। Yadea GT60 ঢাকায় অফিশিয়াল শোরুমে পেলাম না। আর Tailg Phoenix F73 মিরপুরে Tailg শোরুমে পেয়ে গেলাম। এর পাশাপাশি Tailg F72, Tailg F52 এই মডেলগুলোও ট্রাই করে দেখলাম। সব মিলিয়ে আমার Phoenix F73 টাই মনে ধরল। মোটামুটি নেয়ার জন্য মনস্থির করলাম। যেই উইকেন্ডে নিব ভাবতেছিলাম তার আগের বুধবার পিকাবুতে বাইকটা লঞ্চ হয়। পিকাবুতে আগে থেকেই কিছু ইলেকট্রিক বাইক অনলাইনে সেল হতো। এবার আমার পছন্দের মডেলটা পেয়ে গেলাম। ওরা ৬ মাসের ০% ইএমআই ও ফ্রি ডেলিভারীতে দিচ্ছে বাইকটি। যেহেতু বাইকটা একবার দেখে এসেছি তাই অনলাইনেই নিয়ে নিলাম। জানুয়ারীর ৮ তারিখ দুপুরে ৬ মাসের ইএমআইতে পিকাবুতে অর্ডার করলাম। জানুয়ারীর ১৪ তারিখ আমি বাইকটা আমার বাসায় পাঠাও এর মাধ্যমে ডেলিভারী পেলাম।

Honda Livo 110cc standing on a single stand
Honda Livo 110 cc
Tailg Phoenix F73 Electric Scooter standing on a single stand
Tailg Phoenix F73

বর্তমানে আমার Honda Livo 110cc একটা মোটরসাইকেল আছে। প্রায় ৪ বছর আমি এই বাইকটি চালাচ্ছি। আমার জীবনের প্রথম মোটরসাইকেল এটি। এটি চালিয়েই আমি বাইক চালানো শিখি। তো আমার একটা মোটরসাইকেল থাকার পরেও স্কুটার নেওয়ার কারণগুলো একটু ব্যাখ্যা করিঃ

১। মোটরসাইকেলে আমি যখন রাস্তায় জ্যামে পড়ি তখন গিয়ার চেপে আগাতে ঝামেলা মনে হয়। স্কুটারে এই গিয়ার শিফটিং এর ঝামেলা নেই। তাই যানজটে চালানো সহজ।
২। স্কুটার চালানো মোটরসাইকেলের তুলনায় সহজ। মোটরসাইকেল চালাতে চার হাত-পা ব্যবহৃত হয়। কিন্তু স্কুটারে এক হাতে এক্সেলারেশন আর দুই হাতে ব্রেক দিয়েই কাজটা হয়ে যায়।
৩। মোটরসাইকেলে করে বাজার করা বা কোন জিনিসপত্র বহন করা কষ্টকর। আমার অনেক খাবার, বাজার বাইক থেকে পড়ে গিয়ে নষ্ট হয়েছে। একবার তো ইঞ্জিনের গরমে বাইকের হ্যান্ডেলে ঝোলানো ব্যাগ ও ব্যাগের ভিতরে থাকা কাপড় পুড়ে গিয়েছিল। স্কুটারের লেগ স্পেসে এবং আন্ডার সিট স্টোরেজে সহজেই এগুলো বহন করা যায়।
৪। আমার বিড়ালদের চিকিৎসার জন্য পেট ক্লিনিকে নিয়ে যেতে হয়। মোটরসাইকেলে আমি কাঁধের ব্যাগে বিড়াল নিতে পারি। স্কুটারে আমি কাঁধে এবং লেগ স্পেসেও ব্যাগে করে বিড়াল নিতে পারব।

এবার তেলের স্কুটার না নিয়ে ইলেকট্রিক স্কুটার কেন নিলাম সেটাও একটু বলে নিইঃ
১। তেলের বাইকে তেলের খরচের তুলনায় ইলেকট্রিক বাইকে বিদ্যুৎ এর খরচ কম।
২। তেলের বাইকের রক্ষণাবেক্ষণ খরচ বেশি। সেই তুলনায় ইলেকট্রিক বাইকে খরচ কম।
৩। ইলেকট্রিক স্কুটার পরিবেশবান্ধব, কালো ধোঁয়া ছড়ায় না, শব্দ দূষণ করে না।

এবার আমি যে ইলেকট্রিক স্কুটারটি নিয়েছি তার ফিচারগুলো নিয়ে একটু কথা বলা যাক।

Specification

Details

Battery

72V/38Ah Graphene

Motor

2000W

Top Speed

75 km/h

Range

100 - 110 km

Brake

Disc/Disc CBS

Tyre

90/90-12 Tubeless

Weight

146 kg

Ground Clearance

125 mm

Price

1,65,990 BDT

Available Colors

Black, Ash

Tailg Phoenix F73 Front Look

Tailg F73 এর অসুবিধাগুলো প্রথমে বলি।

১। এটার গ্রাউন্ড ক্লিয়ারেন্স অনেক কম। তাই ছোট গতিরোধকগুলোও সাবধানে পার হতে হবে।
২। অন্য সব ইলেকট্রিক বাইকের মতোই এটা চালানোর সময় কোন শব্দ হয় না। তাই সামনের পথচারী বুঝতে পারে না যে একটি ইলেকট্রিক বাইক পিছন থেকে আসছে। এজন্য হর্ণ ব্যবহার করতে হবে।
৩। চার্জের দিকে সব সময় খেয়াল রাখতে হবে। কোথাও যাবার সময় দূরত্ব এবং সে অনুযায়ী চার্জ নিয়ে বের হতে হবে। পথিমধ্যে চার্জ যাতে শেষ হয়ে না যায় এদিকে সতর্ক থাকতে হবে।
৪। বাংলাদেশে ব্যবহৃত বেশিরভাগ ইলেকট্রিক বাইকের মতো এটার চার্জিং টাইম বেশি। প্রায় ৮ ঘন্টা সময় লাগে এটা ফুল চার্জ হতে। তাই পথে অল্প একটু চার্জ দিয়ে চালানোর মতো এটা না।

এবার Tailg Phoenix F73 এর ভালো দিকগুলো দেখা যাক।

১। এটাতে খুব দ্রুত স্পিড উঠে। এটা খেয়াল রেখে চালাতে পারলে স্কুটারটি রাইড করা অনেক মজার।
২। সহজেই খাড়া ফ্লাইওভার ও গ্যারেজে উঠে যাওয়ার মতো পর্যাপ্ত শক্তি আছে এই স্কুটারটিতে।
৩। এটা সহজে কোন এক দিকে কাত হয় না। এটার ব্যালেন্স খুবই ভালো।
৪। অন্য ইলেকট্রিক বাইকের মতোই এটাতে রিমোট লক ও রিমোট দিয়ে চালানোর সুবিধা আছে। তাই আমি চাবি ছাড়াই ব্লুটুথ রিমোট পকেটে নিয়ে চালাই। লক করার সময় একটু গাড়ির অনুভূতি পাওয়া যায়।
৫। বেশ মাসকুলীন লুকের স্কুটার এটি। সহজেই পথে যে কারো নজর কাড়ে।
৬। এটার ডিসপ্লে অনেক বড় এবং সচরাচর দেখা অটোরিকশার মতো না। এটা প্রিমিয়াম অনুভূতি দেয়।
৭। এটার সর্বোচ্চ গতি ৭৫ কিমি/ঘন্টা। ৩০০ ফিট বা ফ্লাইওভারগুলোতে এই গতি আমাকে বাড়তি সুবিধা দেয় অন্য যানবাহনের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে।
৮। ডুয়াল ডিস্ক সিবিএস ব্রেকিং এবং ব্রেক পিস্টন ক্যালিপার থাকায় এটার ব্রেকিং সন্তোষজনক।
৯। এটাতে স্পিড লক করার সুবিধা আছে। ৩০০ ফিট এক্সপ্রেসওয়েতে যা ভালো কাজ করে। একটা নির্দিষ্ট গতিতে নিয়ে এটাকে লক করে দেয়া যায়। তখন আর থ্রোটোল ধরে রাখতে হয় না। নির্দিষ্ট গতিতেই বাইকটি চলতে থাকে।
১০। রিভার্স যাওয়ার সুবিধা আছে বাইকটিতে। প্রয়োজনে এটি ব্যাবহার করা যায়। পার্কিং করার সময় কাজে লাগে।

সবদিক যাচাই বাছাই করে সামর্থ্যের ভেতর এই স্কুটারটি নিলাম। বাড়িওয়ালাকে রাজি করিয়ে বাসার গ্যারেজে আমার মিটার থেকে একটা সকেট বসিয়েছি বাইক চার্জ দেওয়ার জন্য। বাসা আর অফিস একই এলাকায় হওয়ায় আমার প্রতিদিনের মুভমেন্ট ১ কিলোমিটারেরও কম। সর্বোচ্চ ৩০ কিলোমিটার যাওয়া হয় মাঝে মাঝে। এছাড়া বাজার করা, ক্লাচ, গিয়ারের ঝামেলায় না গিয়ে সহজে মুভমেন্ট করার জন্য স্কুটারটি নিলাম। স্রোতের বিপরীতে গিয়ে আমি ইভি ট্রাই করতে চাচ্ছিলাম। বাজারের তেলের স্কুটারের ভীড়ে আমার এই ইলেকট্রিক স্কুটার বেছে নেওয়াটা একটা সাহসী সিদ্ধান্ত। আশা করছি সামনের দিনগুলোতে আমার পথচলাকে আরো সুগম করবে আমার ফিনিক্স পাখি Tailg Phoenix F73।

Ofi Khan sitting on Tailg Phoenix F73 Electric Scooter

If you’re going against the tide, don’t expect the tide to carry you

- Kawshar Ahmed

Related Articles

Mist

16.99°C

Dhaka, Bangladesh

Mist
Humidity: 88%
Wind: 0 M/S
TypeRacer.com scorecard for user ofikhan